কবি শামসুর রাহমানকে একবার টেলিভিশনের পর্দায় এক প্রেজেন্টারের মুখোমুখি দেখে ড. হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, ‘শামসুর রাহমান জানেন না, কার সঙ্গে পর্দায় আর কার সঙ্গে শয্যায় যেতে হয়।’ এ নিয়ে তুমুল হইচই হয়েছিল। আজাদ যেহেতু ঢাবির অধ্যাপক, লেখক হিসেবে শক্তিমান, তাঁকে পরাস্ত করা ছিল প্রায় অসম্ভব। বাস্তবতা হচ্ছে, তিনি যা বলতেন বা লিখতেন, সেসবের সামনে থাকতো চমক, পেছনে পরিষ্কার বার্তা।
তারকাহীন পদযাত্রায় বিএনপিও একটি পরিস্কার বার্তা দিয়েছে। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দল এই বেলায় কেন তাদের জনপ্রতিনিধির তালিকায় শোবিজ তারকাদের রাখলো না, তা নিয়ে অনেকে অনেক জল্পনা-কল্পনায় জড়িয়েছেন। আমার সামনে উদ্ভাসিত ৩ কারণ।
১. কোথায় তারকা?
তারকাদের বেশিরভাগই আ. লীগের সঙ্গে জড়িয়েছেন। শেষ ১৫ বছরে এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল যে, প্রায় প্রতিটি অভিনেতা বিভিন্ন পর্বে পরার জন্য মুজিব কোট বানিয়েছেন। নারী তারকারা মুখস্থ করেছেন স্লোগান। আগে শিল্পীদের গান শুনে শ্রোতাদের চোখে জল আসতো, পরে দেখা গেল নিজেদের স্লোগানে নিজেরাই কেন্দে ফেলছেন … এফডিসি থেকে বিটিভি, বেতার থেকে নাট্যমঞ্চ, সর্বত্র তারকা-শিল্পী মানেই আ. লীগের সমর্থক, কর্মী নয়তো অনুরাগী। হওয়ারই কথা। প্রথমত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পক্ষে থাকাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, কাজ পাওয়ার আর কী উপায়! তৃতীয়ত, খুশিতে, ঠেলায়, ঘোরতে।
বিএনপিতে হাতে গোনা যে কজন তারকা আছেন, তারা ছিলেন রীতিমতো আত্মগোপনে। গান করতে না দেওয়া যারা, তারা রন্ধন তারকা হয়েছেন, অভিনয়ের অনেকে হয়েছেন ফেসবুক তারকা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, দলের জন্য করার মতো কোথাও কেউ নেই! থাকার কথাও না, বিএনপির নেতা, কর্মী, সমর্থকেরাও কীভাবে ভোঁজবাজির মতো হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, তা সকলেরই জানা। উপায়ও ছিল না তাদের। কিন্তু শেষমেষ রাজনীতিটা রাজনীতিকদেরই করা উচিত, এই বাস্তবতায় তরী ভিড়িয়েছে বিএনপি।
২. তারকার উচ্চকিত নাটক
কণ্ঠশিল্পী মমতাজ এই উপমহাদেশ তথা বিশ্বসংগীতের গুরুত্বপূর্ণ একজন তারকা। কীসের অভাব ছিল তাঁর? কিন্তু এমপি হতে হয়েছে তাঁকে! দলীয় প্রধানের পক্ষে অযৌক্তিক উচ্চকিত নাটকীয় বক্তব্য দিতে হয়েছে। মানুষ মাত্রা বোঝে, তারকা বোঝে না। ভিডিওর যুগ, বারবার সেসব ভিডিও মানুষের সামনে এসেছে, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাই বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই উচ্চকিত নাটক তাদের দরকার নেই। বিগত প্রজেক্ট ফেল করেছে।
তারকাদের মাধ্যমে নানান রকম অনুরোধ আসে। তাতে অস্বস্থি ও চাপ তৈরি হয়। সেসব পূরণ করা ঝুঁিকপূর্ণ। চরিত্র হননের জন্য কখনও কখনও কোনো কোনো পক্ষ তাদের এগিয়ে দেয়, এজেন্সি টুকে রাখে। সময় মতো ছড়িয়ে দেয়। সুতরাং এত উচ্চঝুঁকি কেন নেবে একটি রাজনৈতিক দল?
৩. ‘তারা’ চান না তারকাদের
আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি যে, সরকারের ভেতরে থাকে লুক্কায়িত সরকার। ‘তারা’ এই তারকাদের আর চান না। তারকার ভারে ডুবে যাওয়া একটি দল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন বিএনপির বর্তমান প্রধান। তারেক রহমান কোনো একটা জায়গায় বলেওছিলেন যে, যে যে পেশার মানুষ থাকুক তাদের মতো। তারকাদের রাজনীতিতে সুযোগ না দেওয়ার বার্তা রয়েছে তাঁর এ বক্তব্যে। তিনি বরং দলকে, প্রকৃত রাজনীতিকদের প্রায়োরিটি দিয়েছেন।
দলের বর্তমান লাইন আপে চোখ রাখলে আমরা কী দেখতে পাই? সংগ্রামী, বঞ্চিত, বিরোধীদের চাপে-মামলায়-হামলায় পর্যুদস্ত অনেকে দলে জায়গা করে নিতে শুরু করেছেন। যদিও বড় পুনর্বাসন এখনও সম্ভব হয়নি, বড় দল বলে কথা। তা ছাড়া সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি আন্তদলীয় কোন্দলে কোনঠাসাদের কেউ কেউ জায়গা পেয়েছেন নারী আসনে। নেপোটিজমও রয়েছে, রয়েছে আরও নানান হিসেবও। তবে পুরোটাই শোবিজ তারকাশূণ্য।
» দল বিএনপির প্রতি তারকাদের কী অবদান?
আমার ধারণা তেমন কিছুই না। তারা ছিলেন নিরাপদ দূরত্বে। অবদানহীন দুধের মাছি কে ভালোবাসে? বরং যদি দলের প্রতি অনুগত থাকেন, তাঁকে হয়তো দেখা যাবে অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। আর তরুণ তারকা! কেন যেন, তরুণদের প্রতি চট্ করে আস্থা রাখেননি দলীয় প্রধান ও তাঁর টিম। উদাহরণ দিয়ে বলতে হয়, চমককে নিয়ে জুলাই-বিরোধীদের নেগেটিভ ক্যাম্পেইন ভালো কাজে দিয়েছে, সেটি আমলে নিয়েছে বিএনপি। তবে গোপন একটা সূত্র দিয়ে রাখি। তরুণদের নিয়ে একটা চমক অপেক্ষা করছে।
» রাজনীতিতে তারকাদের ভবিষ্যত কী
ওই দিন শেষ। তারকাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাও শেষ। হয়তো সারা পৃথিবীতেই। মানুষ দেখেছে, বিনোদন দেওয়া মানুষগুলো রাজনীতিকের চেয়ারে বসলে স্বস্তি দিতে পারে না, রাজনীতিকদের মতো হয়ে যায়। বরং কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষে পরিণত হয়। জুলাই আন্দোলনের সময় কত কত বার বলে কয়ে অনুরোধ করেও কাউকে কাউকে প্রতিবাদ করানো যায়নি। তবে অনেকে প্রতিবাদ করেছেন, কিন্তু প্রতিবাদ শেষে তারা ফিরে গেছেন ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের সামনে; এমপি হতে আসেননি। বিএনপি হয়তো মনে করেছে, অ্যামেচার নরসুন্দর নয়, পেশাদার নাপিত দিয়ে চুল কাটােনাই উত্তম। আ. লীগ যখন ফিরবে, তখন অনেক তারকার জায়গা হবে দলে, সেই ভাবনাটাও ভুল হবে।
আমার বিশ্বাস, তারকাদের দিয়ে অন্যভাবে কাজ করানো হবে, যেভাবে হতো দূর অতীতে। জান-প্রাণ দিয়ে তাঁরা শিল্পচর্চা করে যাবেন, সরকার বা দল বিএনপি তাঁদের অকুণ্ঠ সমর্থণ ও সম্মান দেবেন। কোনোভাবেই আ. লীগ বা বিএনপি বা জামাতের সমর্থক হিসেবে একঘরে করা বা বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে না। কাজ, সম্মান, সম্মাননা, পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হবে না।
তারেক রহমান সম্ভবত মনে করছেন যে, তারকা তৈরি হোক রাজনীতিতে। রাজনীতির তারকারা রাজনীতিতে থাকুক, পর্দা আর মঞ্চের তারকারা থাকুন পর্দা ও মঞ্চে।



